Connect with us

সৃজন মিউজিক

নজরুলের গান ও নীতিমালা

Published

on

সুজিত মোস্তফা
খুব ছোট বেলার কথা। আমরা যখন পাবনা শহরে, বাবা লন্ডনে পড়াশোনায় মগ্ন আমি মাত্র ক্লাস ওয়ানের ছাত্র পাবনা পুলিশ লাইন স্কুলের, তখন আমাদের বাসার অদূরে বাণী সিনেমা হলে বাজতো চলচ্চিত্রের নানান ধরনের গান। কথা বুঝতাম না, বোঝার কথাও না তবে সুর আমাকে পাগল করে দিতো। সে এক রুচি বিকাশের পর্যায় ছিল। এরপর আমার মা’ও আমাকে রেখে চলে গেলেন ছোট দু’ভাই বোনকে নিয়ে লন্ডনে বাবার কাছে। বড় দু’বোন গেল পাবনাতেই নানীর বাসায়, আমি রাজশাহীতে চাচার বাসায়। চাচা রাজশাহী বেতারের প্রোগ্রাম প্রোডিউসার, চাচীও সেখানে চাকুরীরত। ফলে বেতার ভবনে আমার ঘন ঘন যাওয়া আসা হতো।

নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সুজিত মোস্তফা

নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সুজিত মোস্তফা

ওখানকার যন্ত্র-যন্ত্রী-গীতিকার-সুরকার-শিল্পী-সংগীত পরিচালক-কর্মকর্তা সবাই আমাকে নানানভাবে প্রভাবিত করলো অর্থাৎ তাদের কর্মপ্রক্রিয়া এবং আদরে আমি প্রভাবিত হলাম। এখানেও আমার সংগীত রুচি তৈরীর আরেক পর্যায় চললো। তখন রাজশাহী বেতারে কোলকাতার অনেক গান বাজানো হত, ফলে কান মজবুত হওয়া শুরু হলো ঐ বয়সেই। এরপর রুচি তৈরীর নানান গল্প আছে। সব বলে বিষয়টা প্রলম্বিত করবো না। মূখ্য বলার বিষয়টি হলো ভালো গান শোনার আবহ ছাড়াও বাসা থেকে চাপ ছিল রুচিশীল গান শুনবার। নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে যখন উচ্চাঙ্গ সংগীত ও নজরুল সংগীত নিয়ে পড়লাম আমি সংগীতে অন্যতর আনন্দের স্বাদ খুঁজে পেলাম।

যেহেতু ভালো গান চিহ্নিত করা শিখে গেছি, বেশ একটা আভিজাত্যবোধও ঘিরে ধরলো আমায়। মজার ব্যাপার হলো বাবা লন্ডন থেকে নিয়ে এসেছিলেন একটা স্টেরিওফোনিক গ্রামোফোন সেট এবং বেশ কিছু লং প্লে রেকর্ড। এর মধ্যে মনে আছে পেটুলা ক্লার্ক, টম জোনস আর ক্লিফ রিচার্ডের কথা। ইংরেজী ভাষায় গান, বিটস, মিউজিকের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা, কথা টথা কিছুই বুঝিনা কিন্তু পেটুলা ক্লার্কের দ্য আদার মেন’স গ্র্রাস ইজ অলওয়েজ গ্রীণার বা টম জোনসের ডেলায়লা আমার মাথা খারাপ করে দিতো। অর্থাৎ ঐ উচ্চাঙ্গ ও ভারতীয় সুগম সংগীত এবং নজরুল সংগীত রুচি তৈরী হওয়ার সময়ই আমি বুঝলাম ভালো কিছু ভালো লাগার কোন বিধিবদ্ধ নিয়ম বা আইন নেই।

যাই হোক এরপর ঢাকায় এসে ছায়নটে ভর্তি হলাম। ছায়ানটে তখন দেশের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ নজরুল সংগীত শিল্পীর পদচারণা। এদের মধ্যে এবং বাইরের কজনের মধ্যে আমাকে ভীষণ ভাবে অভিভূত করতো সাদিয়া আফরিন মল্লিক, সাবিহা মাহবুব, শাহীন সামাদ, মোঃ হান্নান, নিয়াজ মোঃ চৌধুরী, সুমন চৌধুরী, নীলুফার ইয়াসমীন, ইয়াসমীন মুশতারী, জান্নাত আরা, ফেরদৌস আরা, মানস কুমার দাশ অভিজিত সাহা এরকম বেশ ক’জনের গান। নজরুলের সে একটা যুগ গেছে। ঐ একই সময় কোলকাতা থেকে ক্রমাগত বেরুচ্ছে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া হৃদয় মুচড়ে দেয়া সব নজরুল গীতি, এছাড়াও পূরবী দত্ত, হৈমন্তী শুক্লা, অনুপ ঘোষাল, পিনটু ভট্টাচার্য, অধীর বাগচী, সুকুমার মিত্র, শ্যামল মিত্র, ধীরেন বোস, অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়, রামানুজ দাশগুপ্ত, মান্না দে, ইন্দ্রাণী সেন এবং ফিরোজা বেগমতো বটেই নজরুলের গানের জগতে এক ঝড় তুলে ফেললো।


তখন ঘরে ঘরে, প্রতি অনুষ্ঠানে নজরুলের গান। এবং এর অব্যবহিত পরে যখন অনুপ জালোটা, মোঃ রফি, অনুরাধা পাড়োয়াল এরা আবির্ভূত হলেন নজরুলের গান সব গান ছাপিয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেললো। ঢাকায় আমরা যারা নজরুল গাই প্রত্যেকের তখন চেষ্টা কে কতভাবে অন্যজনকে ছাড়িয়ে যাবো। তখন এত শুদ্ধতা, অশুদ্ধতা বা আদি রেকর্ড বা স্বরলিপির প্রশ্ন আসেনি। এ্কই গানের হয়তো ভিন্ন সুর বা ভেরিয়েশনের কমবেশি পাচ্ছি সেগুলো নিয়েও আমাদের মাথাব্যথা ছিলনা। কারণ আমরা ব্যস্ত ছিলাম অসাধারণ সব শিল্পীর কন্ঠে নজরুলের গানের অসাধারণ মনোমুগ্ধকর সব চিত্রায়ন শুনতে।

এরপর শুরু হলো বাংলাদেশে আদি রেকর্ড, স্বরলিপি এবং শুদ্ধ সুরে গাইবার জন্য এক ব্যাপক আন্দোলন। এই আন্দোলনের সময়ে সবচেয়ে যে বড় ভুলগুলো হলো সেগুলো হলো এইসমস্ত বড় শিল্পীকে আমরা স্বসম্মানে তাদের অবদানের স্বীকৃতি না দিয়ে এবং তাদের সবিনয় অনুরোধ করে হাতে মূল গানগুলো পৌঁছে না দিয়ে অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে তাদের নজরুলের গান থেকে সরিয়ে দিতে তৎপর হলাম। শিল্পী হচ্ছে শিল্প প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। শিল্পীদের যখন ভয় দেখানো হলো, অসম্মান করা হলো তাঁরা মান বাঁচাতে নজরুলের গান গাওয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিলেন ক্রমশ। আমি একদম সর্বশেষ উদাহরণটি দেই। অজয় চক্রবর্তী নজরুলের বেশ কয়েকটি গান গেয়েছেন, প্রতিটিই সুর মাধুর্য এবং হৃদয়হরণে অনবদ্য। অথচ ওঁর গাওয়া নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করায় উনি ঘোষণা দিয়েছেন যে উনি আর নজরুলের গান গাইবেন না। এখন অজয় গাইবেন না কিন্তু অপারঙ্গম সুর ও প্রাণহীন শিল্পী শুধু স্বরলিপির দোহাই দিয়ে নজরুলের গান গেয়ে দেবেন, শ্রোতা নেবে?


এইখানেই শুরু হল নজরুলের জনপ্রিয়তায় ভাটা। আমি কোনসময়ই আদি সুর বা রেকর্ডের বিরুদ্ধাচারণ করিনা কিন্তু কিছু পদ্ধতি আমার বিভিন্ন লেখায় এই সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে উল্লেখ করেছি। কারো ঘুম ভেঙেছে বলে মনে হয়না। যারা নজরুল গাইছেন তারা প্রতি অনুষ্ঠান, আলোচনা, সেমিনার, সকল জায়গায় একই কথা বলে যাচ্ছেন- আদি সুর, আদি রেকর্ড, স্বরলিপি ইত্যাদি। আচ্ছা, আমরা কি এইসব কথা শুনতে গানের অনষ্ঠানে কান পাতি না ভালো গান শুনে প্রাণ মন জুড়াতে চাই? আমাদের উচিৎ এখনো সময় আছে একটি সর্বজন স্বীকৃত গ্রহণযোগ্য উদার নীতিমালা তৈরী করে সকল মানসম্পন্ন শিল্পীদের স্বসম্মানে নজরুলের গান গাইতে আবারো আহ্বান করা। নতুবা এই বিষয়টা কয়েকজন ব্যকরণবিদ, গবেষক, প্রশিক্ষক এবং অবুঝ কর্তাব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তির মত থেকে একসময় মৃদু একটি দীপশিখার মত হয়ে যাবে। এমনকি দীপশিখাটি নিভে যাওয়ার আশঙ্কা যদি করি সেটিও উড়িয়ে দেয়া যাবে না।
*এই লেখাটা নিয়ে আমি শুধু সহমত, বা লাইক চাই না। ব্যাপক আলোচনা চাই। সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে আমার আরো একটি লেখা আছে যেটি প্রনস এ প্রকাশিত হয়েছে, সেটি প্রয়োজনে এখানে দিয়ে দেবো।

Advertisement
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Dhaka Attack Unreleased Song

Advertisement
কাজী শুভর গানে কলকাতার পল্লবী কর ও প্রেম কাজী
সৃজন মিউজিক2 years ago

কাজী শুভর গানে কলকাতার পল্লবী কর ও প্রেম কাজী (ভিডিও)

Praner Giutar
নতুন গান3 years ago

ভালোবাসা দিবসে দুই বাংলার মিশ্রণে ‘প্রাণের গীটার’

প্রাণের গীটার
নতুন গান3 years ago

মাহফুজ ইমরানের‌ এক বছরের সাধনার ফসল ‘প্রাণের গীটার’ (ভিডিও)

কণ্ঠশিল্পী শাহজাহান শুভ
সৃজন মিউজিক3 years ago

শাহজাহান শুভ’র ‘কথামালা’ গান অন্তর্জালে

ওমরসানী, শাকিব খান ও জায়েদ খান
বিনোদন3 years ago

শাকিব খানের কাছে ক্ষমা চাইলেন জায়েদ খান

নতুন গান3 years ago

রোহিঙ্গাদের নিয়ে গান গাইলো অবস্‌কিওর

সৃজন মিউজিক3 years ago

প্রকাশ হলো ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবির অরিজিত সিংয়ের সেই গান

ব্যান্ড সঙ্গীত3 years ago

শাকিরার নতুন মিউজিক ভিডিও ‘পেরো ফিয়েল’

মিউজিক ভিডিও3 years ago

তানজীব সারোয়ারের নতুন গান

মিউজিক ভিডিও3 years ago

ইউটিউবে কুমার বিশ্বজিতের নতুন গান ‘জোছনার বর্ষণে’

Trending